আব্বার পরোক্ষ পাঠ

0
665

 

সিফাতুল ইসলাম সিফাত :

২০০৫ সালে এসএসসি পাস করে যখন ঢাকায় ঢাকা কলেজে ভর্তি হলাম চোখে মুখে রাজ্যের রোমাঞ্চ। কোথায় থাকবো কিভাবে আসা যাওয়া করবো তার কিছুই জানি না। শুধু জানি আব্বা যেহেতু প্রতিদিন ঢাকায় অফিসে যাতায়াত করেন আমিও পারবো। স্কুল পাশ করা একটি ছেলের জন্য বিষয়টি মোটেও সহজ নয় আবার কঠিনও নয়। মোটামুটি পাচঁ ছয় মাস সোনারগাঁও থেকে বোরাক বাসে করে কলেজে আসা যাওয়া করতাম। তখন সোনারগাঁও থেকে নিউমার্কেট বোরাকে যাওয়া যেতো। ভাড়াঁ ছিল গুলিস্তান পর্যন্ত ১৮ আর নিউমার্কেট ২২ টাকা। যেহেতু ঢাকা কলেজ নিউমার্কেটের পাশেই আমার যেতেও খুব সুবিধে হত। কিন্তু প্রতিদিন ঢাকায় যাওয়া আসার জন্য সময় লাগতো অনেক যার জন্য বাসায় এসে আর পড়ার শক্তি থাকত না, তার উপর নিয়মিত আব্বার কাছে থেকে টাকা নিতে হত যাতায়াত ভাড়া আর হাত খরচ এর জন্য। স্কুলে থাকতে টাকা পয়সা চাওয়ার ক্ষেত্রে কখনই এতটা সাবলীল ছিলাম না। মাঝেমধ্যে আম্মার কাছ থেকে দশ বিশ টাকা চাওয়ার মধ্যেই যেন সীমাবদ্ধ ছিল আমার আর্থিক ক্ষমতা। কলেজে উঠে সেই সঙ্কোচ যেন হঠাৎই উধাও হয়ে একদম বড় হয়ে গেলাম।

আসলে বাবা মার সাথে যতই সখ্য থাকুক না কেনো সন্তানের সাথে আসল বোঝাপড়ার সম্পর্ক তৈরী হয় যখন বাবা মা তার সন্তানকে নিজ হাতে খরচ করার স্বাধীনতা দেন। আব্বার সাথে এর আগে হয়তো দরকার না হলে কিছু চাইতাম না বা দৈনিক উঠা বসা, খাওয়া দাওয়ার মত নিয়মিত কিছু পারিবারিক কথোপকথন হত কিন্তু কলেজে ভর্তি হওয়ার পর সেই ছয় মাস যখন বাসা থেকে বের হওয়ার সময় আব্বার কাছ থেকে টাকা নিয়ে বের হতাম আব্বা যে কত কাছের আর প্রয়োজনীয় মানুষ তখন তা বুঝতে শিখলাম।

যাতায়াতের কষ্ট কিছুটা কমলো যখন আমি ঢাকায় একটি মেসে উঠলাম। সোনারগাঁওয়ের আমার আরেক বন্ধু শাকিল তখন আইডিয়াল কলেজে পরতো। আমার ঢাকা কলেজের কয়েক বন্ধু, শাকিল আর আমি পাচঁ জন মিলে একটা বাসা নিলাম আজিমপুরের নিউপল্টন এলাকায়। সোনারগাঁও ছেড়ে পার্মানেন্টলি সেই আমার ঢাকা আসা। আসার সময় আম্মা আমার জন্য কাথা বালিশ, কাপড়চোপর গুছিয়ে দিলেন, আব্বার সাথে রওনা দিলাম ঢাকার উদ্দ্যেশে। পথে পানামে দেখা হলো আবুল হাসেম কাকার সাথে। আবুল হাসেম কাকা ছিলেন আমাদের গ্রামের মসজিদের সভাপতি আর গ্রামের মুরুব্বী। দেখা হতেই আব্বা কাকাকে বললেন যে আমি ঢাকা চলে যাচ্ছি, এখন থেকে ওখানে থেকেই পড়াশোনা চলবে। হাসেম কাকা তখন বললেন, “যা, তবে কখনো এমন কাজ করিস না যাতে তোর বাবার সম্মান হানি ঘটে, আর কি করলে গ্রামের মানুষের মুখ উজ্জ্বল হয় সেটা করিস। অনেকেই গ্রাম থেকে ঢাকা গিয়ে আবার গ্রামে ফিরে আসছে, জীবনে ভালো কিছুই করতে পারে নাই। তোর উপর আমার ভরসা আছে ভালো কিছু করবি, সাবধানে যা”। হাসেম কাকাকে সবসময় শ্রদ্ধা করতাম। তার সেদিনের কথাগুলো আমাকে সবসময়ই অনুপ্রাণিত করেছে, আল্লাহ উনাকে জান্নাত দান করুক।

ঢাকায় থাকা শুরু করার পর আব্বা আম্মা আমাকে মাসে মাসে টাকা দিত বাসা ভাড়া আর পড়াশোনার অন্যান্য খরচ বাবদ। আমি সুযোগ পেলেই বাড়ি চলে আসতাম। আব্বা পড়াশোনার খোঁজ খবর নিতেন। কলেজের পরিবেশ কেমন, স্যার-ম্যাডাম দের আচরণ কেমন, তারা আমাকে কেউ চিনে কিনা? সৌভাগ্যবশত কলেজে প্রথম সেমিস্টারে আমি সারা কলেজের মধ্যে প্লেসে চলে আসি, সেই সুবাদে কলেজের শিক্ষকরা আমাকে ভালোই চিনে ফেলেছিল। সারা দেশের প্রায় সব জেলা থেকে মেধাবী শিক্ষার্থীরা আসে ঢাকা কলেজে পড়তে, সেখানে নিজেকে আলাদা করে সবার মাঝে তুলে ধরতে পারার কথা শুনে আব্বা প্রশংসা করলেন। তিনি কখনোই আমার উপর কিছু চাপিয়ে দেননি। পড়াশোনা বিষয়ে কোনো টার্গেট দেননি, সবসময় খোলামেলা আলোচনা করতেন, আমার কাছ থেকেই শুনতে চাইতেন যে আমি কি করতে চাই, কেনো করতে চাই। আব্বা খুব চাইতেন আমি যেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারা কতটা গৌরবের সে বিষয়ে বিভিন্ন গল্প করতেন। নিজের মধ্যে একটা আত্মবিশ্বাস তৈরীর মাধ্যমে কিভাবে পথ চলতে হয় তার পরোক্ষ পাঠ দিতেন সেইসব আলোচনার মাধ্যমে। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়ে নিজের পছন্দের বিষয়ে পড়তে পেরে আব্বার অনুক্ত ইচ্ছা পূরণ করতে পেরেছিলাম। জীবনে ছোটখাট সমস্যা থেকে বড় যেকোন বিষয়ে নিজে নিজে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ইন্ধন দিতেন ভাল মন্দ বিচার বিবেচনার কথা বলে। ব্যক্তিস্বার্থ থেকে সামগ্রিক স্বার্থ বড় সেই বুঝ আমার ছোটবেলা থেকেই হয়ে গিয়েছিল আব্বার অসাধারণ জীবন যাপন দেখে। ব্যাক্তিজীবন সম্পর্কে তার অসাধারণ উপলব্ধি, সমাজ জীবনে ন্যায়-অন্যায় বোধ, ধর্মীয় জীবনে শুদ্ধাচার ও সরলতা, মানুষের জন্য পরোপকারীতা আমাকে চরমভাবে প্রভাবিত করেছে।

আব্বা বন্ধুবৎসল ও সংগঠন প্রিয় মানুষ ছিলেন। সোনারগাঁও জাদুঘরের সেই নকশীকাথাঁর মাঠ থেকে শুরু করে সোনারগাঁও সাহিত্য নিকেতন, সোনারগাঁও প্রেসক্লাব সহ বিভিন্ন সাহিত্য ও সামাজিক কার্যক্রমে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিক্ষক, সমাজকর্মী, রাজনীতিক ও সাধারণ মানুষের সাথে তার নিত্য চলাফেরা। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি তার বন্ধু সহকর্মীদের সাহচার্য ও ভালবাসা পেয়েছেন। সবার জন্য আমাদের বাড়ি ছিল নিজের বাড়ির মত। ছোটবেলা থেকেই তাদের সাথে আমিও যেনো সাংগঠনিক কার্যকলাপে অভ্যস্থ হয়ে গিয়েছিলাম। যদিও সাহিত্য চর্চার মত গভীর জীবনবোধ আমার এখনো তৈরি হয় নি আর সাহিত্য আমার পারদর্শিতার জায়গাও না কিন্তু কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ও চাকুরী জীবনে সাংগঠনিক যেসব অর্জন তার শিকড় অবশ্যই এর মধ্যে নিহিত। পূর্বপুরুষ থেকে বংশপরম্পরায় রক্তের ধারাবাহিকতায় কিছু জৈবিক ও সামাজিক আচরণ মানুষের মধ্যে চলে আসে, এগুলো হয়তো সেরকমই কিছু। আব্বা তার জীবনভর সাহিত্য চর্চা, সমাজ সংস্কার,নির্লোভ সত্যজীবন যাপনের চর্চা করে গেছেন। সবচেয়ে সাধারণ জীবন যাপন করা যে কতটা অসাধারণ সেটা তাকে স্মরণ করলেও বোঝা যাবে। এখন তার মত করে, তার রেখে যাওয়া কাজ ও প্রতিষ্ঠান গুলোর উত্তরাধিকার রক্ষাও আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হয়ে থাকবে।

** বাবা দিবসে ফেসবুক থেকে নেয়া