একজন সফল মায়ের জীবন গাঁথা

0
475

 

শাহেদ কায়েস :

রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বেগম রোকেয়া দিবস ২০২০ জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ কার্যক্রমের আওতায় “সফল জননী নারী” ক্যাটাগরিতে নারায়ণগঞ্জ জেলার ‘সেরা মা’ নির্বাচিত হয়েছেন আমাদের সোনারগাঁওয়ের আসমা আখতারী আপা!

আসমা আখতারীর দুই সন্তান মো. সিফাতুল ইসলাম এবং মো. তৌহিদুল ইসলাম শ্রাবণ। প্রথম সন্তান মো. সিফাতুল ইসলাম ৩৫ তম বিসিএস, সংযুক্ত কর্মকর্তা, a2i (Access to Information), আইসিটি ডিভিশন; দ্বিতীয় সন্তান মো. তৌহিদুল ইসলাম শ্রাবণ মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। কঠিন জীবন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আসমা আখতারী আজকে এই পর্যায়ে পৌঁছেছেন। তিনি তাঁর দুই সন্তানকেই নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও সমাজে সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন।

আসমা আখতারী সোনারগাঁওয়ের সন্তান। ১৯৭৬ সালে আমিনপুর ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ড-এর গোয়ালদী গ্রামে আসমা আখতারীর জন্ম। বর্তমানে তিনি সোনারগাঁয়ের আদমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে কর্মরত এবং সোনারগাঁও সাহিত্য নিকেতনের সহ-সভাপতি। তিনি সোনারগাঁও প্রেস ক্লাবের অন্যতম সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং সাবেক সভাপতি, সোনারগাঁও সাহিত্য নিকেতনের প্রতিষ্ঠাতা লেখক-সাংবাদিক মরহুম বাবুল মোশাররফের জীবন-সঙ্গিনী।

তাঁর এই সম্মাননা প্রাপ্তিতে আমরা অত্যন্ত গর্বিত ও আনন্দিত। তাঁকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।

আসমা আখতারীর জীবন ও তাঁর সংগ্রাম:

নাম: আসমা আখতারী
স্বামী: বাবুল মোশাররফ
মাতা:ফাতেমা বেগম
গ্রাম: বাগমুছা, সোনারগাঁ পৌরসভা, সোনারগাঁ, নারায়ণগঞ্জ
জন্মস্থানঃ ১৯৭৬ সালে আমিনপুর ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ড-এর গোয়ালদী গ্রামে আসমা আখতারীর জন্ম।

পাঁচ বোন ও এক ভাই এর সংসারে তিনি সবচেয়ে বড় সন্তান। বাবা গিয়াসউদ্দীন মুন্সী মসজিদে ইমামতী, কৃষিকাজ ও চায়ের দোকানদারি করে সংসার চালাতেন। মা ফাতেমা বেগম ছিলেন গৃহিণী।

শৈশব ও কৈশোর:

শৈশবে গোয়ালদি গ্রামের মুন্সী বাড়ীতে মাদ্রাসা শিক্ষার মাধ্যমে পড়াশোনার হাতেখড়ি হয়। ছোটবালা থেকেই আসমার মেধা ও স্মৃতি শক্তি দেখে শিক্ষক ও মুরুব্বীগণ আশীর্বাদ করেন। পরপর ছয় ভাইবোনদের মধ্যে বড় আসমা সবার পড়াশোনার দায়িত্ব নেয়।

শিক্ষাজীবন:

তার শিক্ষা জীবন শুরু হয় গোয়ালদি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। পঞ্চম শ্রেণীতে বৃত্তি প্রাপ্ত হন এবং পরবর্তীতে তিনি সোনারগাঁও জি. আর. ইনস্টিটিউট এ ভর্তি হন। ১৯৯২ সালে প্রথম বিভাগে এসএসসি এবং ১৯৯৪ সালে দ্বিতীয় সন্তান গর্ভে নিয়ে সোনারগাঁও ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পরিক্ষার উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে বি এস এস পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

বৈবাহিক ও পারিবারিক অবস্থা:

দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় অত্যন্ত মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও তাকে ষষ্ঠ শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার পর একজন সরকারি চাকরিজীবী ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়। বিবাহের পরেও তীব্র আগ্রহ থাকায় স্বামীর সহযোগিতায় তিনি লেখাপড়া চালিয়ে যান। বিয়ের এক বছর পরই সপ্তম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় তার প্রথম সন্তান জন্ম হয়। সন্তান জন্মের ছয় মাস পর তার স্বামী বিশেষ কারনে স্বেচ্ছায় সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন। তখন থেকে তার সংসারে অনেক অভাব অনটন দেখা দেয়। কখনো বাবার বাড়ি কখনো শ্বশুর বাড়ি থেকে সন্তানকে কোলে নিয়ে স্কুলে যাওয়া শুরু হয়। “শিশুর কোলে শিশু” গ্রামবাসী দের এমন ধরনের উক্তি ও শুনতে হয়েছে অনেক। তবুও ভবিষ্যতে সন্তানকে মানুষ করার আশায় নিজের পায়ে দাড়ানোর দৃঢ় প্রত্যয় স্থাপন করেন।

পরিবারের বাড়তি আয়ের জন্য পড়াশোনার পাশাপাশি তখন থেকেই টিউশনি করা, পুতির কাজ, নকশিকাঁথা সেলানো, রাতের আধারে একাকি টুপি সেলানো ইত্যাদি কাজ করতে থাকেন। এভাবে নিজের ও ছেলের লেখাপড়ার খরচ চালাতেন।

পরবর্তীতে তিনি সোনারগাঁও জি আর ইনস্টিটিউশন এর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাত্র ৫০০ টাকা বেতনে শিক্ষকতা শুরু করেন। কিন্তু এখানে তাকে টানা ৩ বছর বিনা বেতনেই চাকরি করতে হয়। সব কিছুর মাঝেও বিদ্যালয়ে সকল শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকারী হতেন। কলেজে পড়াকালীন তার দ্বিতীয় সন্তান জন্ম হয় এবং প্রথম ছেলের লেখাপড়ার খরচ বাড়তে থাকে। অভাবের সংসারেও ছেলের লেখাপড়া চালিয়ে যান তিনি।

পরবর্তীতে ছেলের ভালো ফলাফলের জন্য সকল শিক্ষকের নজরে আসে; কয়েক বছর পর ছোট ছেলের লেখাপড়া শুরু হয়। টানা ১০ বছর স্থানীয় কমিউনিটি স্কুলে ৫০০ টাকা বেতনে চাকরি করার পর ২০০৭ সালে তার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকরি হয়। তখন থেকে দুই ছেলের উচ্চ শিক্ষা চালিয়ে যেতে খানিকটা কম বেগ পেতে হয়েছে তাকে।

বর্তমানে তিনি একজন সফল শিক্ষক, সমাজকর্মী, সাহিত্যকর্মী এবং একজন সফল জননী। তার বড় ছেলে মো: সিফাতুল ইসলাম স্থানীয় স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে পরবর্তীতে ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজ থেকে এইচ এস সি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করে এবং ৩৫ তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়। বর্তমানে সে সরকারের আইসিটি মন্ত্রণালয়ের এটুআই প্রকল্পে কর্মরত আছে।

ছোট ছেলে মো: তৌহিদুল ইসলাম শ্রাবণ চট্টগ্রামে বাংলাদেশ মেরিন একাডেমিতে পড়াশোনা সম্পন্ন করে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে বিদেশী কোম্পানিতে সমুদ্রগামী জাহাজে কর্মরত আছে।

বাল্যবিবাহ, পারিবারিক দারিদ্রতাসহ সমাজের নানা প্রতিকুলতা পেরিয়ে নিজের জীবন এবং নিজের পরিবারের সকলের জীবনে সফলতা আনয়নে তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার এই পথ চলার সাথী হিসেবে সব সময় সাথে ছিলেন তার স্বামী মরহুম বাবুল মোশাররফ। ব্যক্তিগত জীবনে খুবই সৎ ছিলেন তিনি, পেশায় একজন স্বনামধন্য সংবাদিক ছিলেন। জাতীয় বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় গুরুত্বপূর্ন পদে কর্মজীবন পার করেছেন, পাশাপাশি সোনারগাঁও প্রেসক্লাবের ৫ বারের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

এছাড়া সাহিত্য কর্ম, সমাজ সেবা এবং তরুণদের মাঝে সাহিত্যের আলো ছড়িয়ে গেছেন সারাজীবন। উল্লেখ্য তিনি ২০১৯ সালের ১৫ ই নভেম্বর মাসে ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরন করেন। মৃত্যুকালে তিনি সোনারগাঁও সাহিত্য নিকেতনের সভাপতি ছিলেন।

আসমা আখতারীর কর্মজীবন ও সমাজসেবা:

১৯৯৭ সালে সোনারগাঁও জি. আর. ইন্সটিটিউশন কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যলয়ে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর আনুষ্ঠানিক কর্মজীবন শুরু হয়। টানা ১০ বছর স্থানীয় কমিউনিটি স্কুলে মাত্র ৫০০ টাকা সম্মানীতে চাকরি করার পর ২০০৬ সালে তিনি সনমান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তারপর সোনারগাঁও এর বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সফলতার ও সুনামের সহিত শিক্ষকতা করেন। বর্তমানে আদমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সিনিয়র সহকারি শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন কাব স্কাউট প্রোগ্রামের। এছাড়াও সরকারের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, জাতীয় ও আঞ্চলিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন।

শিক্ষকতার পাশাপাশি কারুশিল্পীদের প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য তাঁর স্বামীর সহায়তায় প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘নকশীকাথার মাঠ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান, সোনারগাঁও লোক ও কারু শিল্প জাদুঘরে পরিচালনা করছেন একটি কারুশিল্প প্রতিষ্ঠান, সাংবাদিক স্বামীর অনুপ্রেরণায় যুক্ত আছেন সাহিত্যকর্মে। আসমা আখতারী বর্তমানে সোনারগাঁও সাহিত্য নিকেতনের সহ সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

লেখক : শাহেদ কায়েস: কবি, শিক্ষক ও মানবাধিকার কর্মী । প্রতিষ্ঠাতা, সুবর্ণগ্রাম ফাউন্ডেশন

আপনার মতামত কমেন্টস করুন