ফুলের গ্রাম সাবদি

0
1346

হাসান মাহমুদ রিপন:

ফুলের ওপর বসে মধু আহরণ করছে শত শত মৌমাছি। সূর্যমুখীতে যেন সূযের হাসি ফুটে উঠেছে কৃষকের মুখে। সেসব নয়নাভিরাম দৃশ্য কেবলই সবাইকে কাছে টানে। সারি সারি ফুলের গাছ। লাল, হলুদ, বেগুনী আর সাদা রঙের ফুল এবং সবুজ পাতায় মোড়ানো ফুলের অজস্রগাছ। পুরো মাঠ যেন তারার মেলা। চারদিক থেকে যদি হাওয়ায় ভেসে ভেসে ক্রমাগত বাহারি ফুলের গন্ধ ছুটে আসে তবে ঘুম না আসারই কথা। ফুলের গন্ধে ঘুম কেড়ে নেওয়ার মতোই একটি গ্রাম সাবদি। যেদিকে দু’চোখ যায় কেবল ফুল আর ফুল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেই চোখ জুড়িয়ে আসতে চায়। ফুলের সুবাস যেন মন ভরিয়ে দেয়। এমন ফুলের রাজ্যে যেতে চাইলে আপনাকে খুব বেশি কষ্ট করতে হবে না। ঢাকার কাছেই নারায়ণগঞ্জের বন্দরের সাবদি গ্রাম। এ গ্রামের আশ পাশের সব জমি ও বাড়ির আঙ্গীনায় কাঠমাতলতী, গাঁদা, ডালিয়াসহ হরেক রকমের ফুলের বাগান। সাবদি গ্রামসহ আশ পাশের আরো গ্রাম গুলোতে কেউ পা রাখলেই বিস্মিত হয়ে ওঠে। গ্রামগুলোকে ঘিরে শুধু বাগান আর বাগান। কয়েক বর্গমাইল এলাকাব্যাপী কাঠমালতি, গাঁদা, ডালিয়া ও জিপসী ফুলের গুচ্ছ গুচ্ছ বাগান। বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু করে গ্রাম গুলোর রাস্তার দু’ধারে হাজারো কাঠমালতির সারি সারি বাগান। সারা গ্রামের সব জমিতে ফুল আর ফুল। ফুলের সাম্রাজ্য সাবদি ছাড়া বিরতহীন দেখা মেলে দিঘলদী, সেলশারদী, মাধবপাশা, আইছতলাসহ সোনারগাঁও উপজেলার সম্ভুপুরা ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে। এসব গ্রামে কাঠমালতি, গাঁদা, বেলী ও জিপসী ফুলের বাগান করে শতাধিক মানুষের পরিবারে স্বচ্ছলতা ফিরে এসেছে। তাই সাবদী ও দিঘলদী গ্রামকে এখন সারাদেশে ফুলের গ্রাম নামে পরিচিত লাভ করে।
নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার সাবদি, দিঘলদী গ্রামের অবস্থান। গ্রামগুলোর পাশ ঘেঁষে বয়ে চলেছে ব্রহ্মপুত্র নদ। নদের পশ্চিম ধারে সারি সারি কাঠমালতির বাগান। ফুলের চাষাবাদ করে এ এলাকার লোকজন তাদের ভাগ্যের চাকার পরিবর্তন করেছে। বদলে গেছে এ গ্রামের সকল দৃশ্যপট। ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে ছায়া ঢাকা, পাখি ডাকা শান্ত পরিবেশের গ্রামগুলোতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫/৬ হাজার লোক জড়িত আছে ফুল বিষয়ক বানিজ্যে। তারা ফুল উৎপাদন, ফুলের মালা তৈরি ও ফুল বিক্রিতে সরাসরি জড়িত আছেন। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার ফুল ঢাকা শাহবাগ ও চট্টগ্রামের ফুলের আড়তে যায়। এখানকার ফুল রাজধানী ঢাকাসহ বাংলাদেশের সব প্রান্তের চাহিদা পূরণ করে থাকে। এমনকি চাষকৃত ফুল কয়েকটি দেশে রপ্তানিও করা হয়। এতে যেমন কৃষকের লাভ বেড়েছে তেমনি অনদিকে বেড়েছে দেশের সুনাম। সরকারও লাভবান হচ্ছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সময় চাষীদের ব্যস্ততা খুব বেড়ে যায়।


দিঘলদী গ্রামের বেকার যুবক সুধেব চন্দ্র দাস প্রথম এ গ্রামে ফুলের চাষ শুরু করেন। পরবর্তীতে আরো কয়েকজন বেকার যুবক ওই গ্রামে সুধেবের দেখাদেখি ফুলের চাষাবাদ করেন। ওই গ্রামের রহমতউল্লাহ ১৯৯২ সালে ডেমরার বাওয়া জুট মিলের চাকুরী চলে যাওয়ার পর তিনি ঢাকায় ফেরি করে ফুলের ব্যবসা শুরু করে। পরবর্তীতে ওই গ্রামের অপর ফুল ব্যবসায়ী মোতালেবের উৎসাহে ১৯৯৫ সালে তিনি গ্রামে এসে বাৎসরিক ইজারা ভিত্তিতে অন্যের জমিতে ফুল চাষ শুরু করেন। বর্তমানে রহমতউল্লাহর ফুল চাষ করে নিজে ২০ বিঘা জমির মালিক হয়েছেন। রহমতউল্লাহর মত ওই গ্রামের ইসমাইল হোসেন, নকুল চন্দ্র হাওলাদার, শরীফ, আবদুল বাতেন, এমদান হোসেন, শফিকুল ইসলাম, মোসলেমউদ্দিন, আব্দুল মান্নান, জাকির, আনোয়ার হোসেন, ইকবাল, মোস্তফা, সিরাজ, জহির, সিদ্দিক, ইউসুফ, মনিরসহ প্রায় দু’শতাধিক লোক কাঠমালতি গাঁদা, জিপসী ও বেলী ফুলের চাষ করছেন। এ ফুল চাষের পেশার সাথে জড়িয়ে আছে আরো প্রায় ১ হাজার শ্রমিকের জীবিকা। এ ফুল চাষে পুরুষদের পাশাপাশি মহিলা ও স্কুলে পড়–য়া ছাত্রছাত্রীরা জড়িত রয়েছে। তারা প্রতিদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠে কাঠমালতির ফুল বাগানে কলি আহরনের উদ্দেশ্যে যায়। সাংসারিক সুখ দুঃখের আলাপ চারিতার ফাঁকে ফাঁকে ডালা ভরে ফুল কলি তোলে যার যার বাড়িতে ফিরে আসে।

কাঠমালতির ফুল দিয়ে ‘গাজরা’ ও ফুল কলির লহর বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সাবদী, দিঘলদীসহ ওই এলাকার সকল মহিলারা। স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাও সকাল ৯ টা পর্যন্ত কলি তুলে স্কুলে যায়। তারা আবার বিকেলে বাড়ি ফিরে ফুলে লহর বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এদিকে ফুলচাষীরা বাগান থেকে তুলে আনা ফুল বাড়ির আঙ্গিনায় মালা গেঁথে সেগুলো সন্ধ্যায় সাবদি বাজারে নিয়ে জড়ো করে। সাবদি বাজার থেকে ট্রাকে করে পাইকাররা প্রতিরাতে এসব ফুল ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিযৈ যায় বিক্রির জন্য। তিনধাপে কাঠমালতি ফুল বাজার জাত হয়। প্রথম ধাপে বাগান করা, দ্বিতীয়ধাপে ফুল ক্রয় করা এবং তৃতীয় ধাপে তা শাহবাগে এবং চট্টগ্রামের ফুলের হাটে কাঠমালতির ফুলকলি বাজারজাত করা হয়। বাসর ঘবে সাজানো জন্য এবং বিভিন্ন পুজা আর্চনায় কাঠমালতি ফুল কলির ব্যাপক চাহিদা আছে বাজারে। তাছাড়া বর্তমানে আধুনিক তরুনীদের খোঁপায় কাঠমালতির ফুলকলির “গাজরার” ব্যবহার বেড়ে যাচ্ছে।


ফুল চাষি শফিকুল ইসলাম জানান, ১৯৯৯ সালে এসএসসি পাস করার পরে তিনি পৈত্তিক সম্পত্তিতে ফুল চাষ শুরু করেন। আগে এইসব জমিতে নানা রবিশস্যের চাষ করা হতো। গ্রামের অন্য ফুল চাষিদের দেখে তিনি অনেকটা শখের বশেই ফুল চাষ শুরু করেন। তবে সেসময় খুব বেশি ফুল চাষি ছিলেন না। গত এক যুগে তিনি ফুল চাষ করে নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করেছেন।
ডালিয়া চাষী মোছলেউদ্দিন জানান, তিনি এক বিঘা জমিতে ডালিয়ার চাষ করেছেন। ১ হাজার চারা ১০ টাকা দরে ১০ হাজার টাকার চারা রোপন করেছিলেন। গত চার মাসে মজুরী ও সারের খরচ বাবদ আরো ৪০ হাজার টাকা গেলেও এপর্যন্ত তিনি প্রায় ১ লাখ টাকার ফুল বিক্রি করেছেন আরো ফুল জমিতে রয়েছে।
ফুলচাষী কৃষক আনোয়ার হোসেন জানান, কাঠবেলী ফুলের চাষ বেশি হয়ে থাকে। কারণ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ও ভালোবাসা দিবসে এর চাহিদা থাকে। আর এ কারণে এই ফুল চাষের প্রতি চাষীদের আগ্রহ বেশি। গø্যাডিওলাস ফুল এক বিঘা জমিতে চাষ করা হলে প্রায় আট হাজার স্টিক পাওয়া যায়। এছাড়াও এখানে ডালিয়া, জিপসি, আলমেন্দা, গাঁদা ও রজনীগন্ধা ফুলের চাষ করা হয়। ফুলচাষীরা জানান, তারা রবি শস্য চাষ করে যা পান তার থেকে আট দশগুণ বেশি লাভবান হচ্ছেন ফুল চাষ করে। এ কারণে অনেকেই বাপ-দাদার আদিম চাষ পরিবর্তন করে ফুল চাষের প্রতি ঝুঁকেছেন। আর এতে লাভও হচ্ছে। এ গ্রামের মানুষ ফুল চাষ করে তাদের পুরো এলাকার চিত্র পাল্টে দিয়েছে। গ্রামের সবাই এখন স্বাবলম্বী। একটু অবসর পেলেই দৃষ্টি এবং মন জুড়াতে চলে যেতে পারেন সাবদি এবং তার আশপাশের গ্রামগুলোয়। আপনার জন্য অপেক্ষা করছে অপরূপ সৌন্দর্যের অন্য এক ভুবন।

 

আপনার মতামত কমেন্টস করুন