বর্ষার মোহনীয় রূপ

0
476

 

হাসান মাহমুদ রিপন ::

এসো হে সজল ঘন বাদল বরিষণে
বিপুল তব শ্যামল স্নেহে এসো হে এ জীবনে ॥
এসো হে গিরি শিখর চুমি ছায়ায় ঘেরা কানন ভূমি,
জীবন ছেয়ে এসো হে তুমি গভীর গরজনে ॥
অবিরাম বৃষ্টি মাঝে বর্ষার মন মোহনী রূপটি বাংলার প্রকৃতিকে সৌন্দর্যের মেলা বসায়। বর্ষার রূপ বৈচিত্র্য দোলা দেয় কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা এই বর্ষার কবিতায় ।

এসেছে বর্ষাকাল। বর্ষা আসে নূপুর পায়ে ঝমঝমিয়ে। বর্ষার গুনগান গেয়ে কবিরা লেখেন কবিতা। ভাবুক মন হয় উতলা। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন “ বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান, আমি দিতে এসেছি শ্রাবনের গান/ মেঘের ছায়ায় অন্ধকারে রেখেছি ঢেকে তারে, এই যে আমার সুরের ক্ষেতের প্রথম সোনার ধান/ আজ এনে দিলে হয়তো দেবে না কাল, রিক্ত হবে যে তোমার ফুলের ডাল/ এ গান আমার শ্রাবণে শ্রাবনে তব বিস্মৃতি স্রোতের প্লাবনে, ফিরিয়া ফিরিয়া আসিবে তরনী বহি তব সন্মান”। রবি ঠাকুর বর্ষার রূপ গন্ধের সাথে নিজেকে একাকার রেখেছেন। লিখেছেন অসংখ্য কবিতা, গান।

বর্ষাই তো বাংলার চিরায়ত রূপ। কখনো রিম ঝিম গান গেয়ে বৃষ্টি নামের মিষ্টি মেয়েটি সুরে সুরে ভরিয়ে তোলে প্রকৃতি। আবার ঝুম ঝুম নূপুর বাজিয়ে মুগ্ধ করে দেয় আমাদের মন। বর্ষায় খাল বিল পুকুর নদী ডোবা পানিতে থই থই করে। সবুজ সজীবতায় গাছ পালা, বন-বনানী প্রাণ ফিরে পায়। আর কতরকম ফুল ফোটে এই বর্ষায়। পানিতে ভরে ওঠা নদী-নালায় আবার ভাসে পালতোলা নাও। খালে –বিলে দস্যি ছেলের দল কলা গাছের ভেলা ভাসিয়ে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়ায়। ডোবা নালার ঘোলা জলে হাপুস হুপুস ডুব সাঁতারে মেতে ওঠে গ্রামের ছেলে-মেয়েরা। এই টাপুর টুপুর বৃষ্টিতেই ধুয়ে মছে পরিষ্কার হয়ে যায় সবকিছু। তখন ভেজা মাটির গন্ধে মন যেন কেমন করে ওঠে। বড় আপন মনে হয় মা ও মাটিকে। এছাড়া খালে বিলে বাংলার জাতীয় ফুল শাপলার অপরূপ দৃশ্যতো আছেই। শাপলা পদ্ম ও রূপ ছড়াতে কম যায় না। কেয়া কামিনী হিজল বকুল জারুল করবী-সোনালু এসবও বর্ষা ঋতুতে ফুটে থাকতে দেখা যায়। আর জুঁই চামেলীকে বাদ দেব কি করে। তবে বর্ষার প্রধান ফুল হল কদম। কদম, কেয়া, জুঁই, চামেলী ফুলের গন্ধে মাতোয়ারা থাকে ফুলবন। বৃষ্ঠি ভেজা কদমের মনকাড়া সৌরভ ভিজে বাতাসে মিশে ছড়িয়ে পড়ে সারা প্রকৃতিতে। সতেজ গাছপালার সবুজ রূপ বাংলাদেশকে এক অপরূপ সাজে সাজায়। সবুজে সবুজে ভরিয়ে দেয় প্রকৃতি আর পরিবেশ।

বর্ষা এলে প্রকৃতি সাজে নতুন সাজে। তৃষিত হৃদয়ে, পুষ্পে-বৃক্ষে, পত্র-পল্ববে নতুন প্রাণের সঞ্চার করে। নূপুর পায়ে ঝুমুর ঝুমুর তালে ঝরে পড়া অঝোর ধারার বৃষ্টিতে ভিজতে থাকে উন্মুখ –অধীর প্রকৃতি। বৃষ্টির ধারায় উপছে পড়ে বাংলার ডোবা-নালা-মাঠ-ঘাট-পুকুর-বিল-হাওর। ঝরঝর নির্ঝরণীতে মানুষের মনকে যুগপৎ আনন্দ-বেদনা ও বিরহকাতরতায় সিক্ত করে তুলে বর্ষা। গাছের ডালে, পাতার ফাঁকে চুপচাপ বসে থাকে পাখিরা। জনশূন্য মাঠ-ঘাট জনশূন্য পথ-প্রান্তর। কখনো জনশূন্য পথের ধারে দাঁড়িয়ে বেভুলো রাখালের সাদা গাভীটি ভিজে একাকার। গাঁয়ের পুকুর অথবা নদীতে বৃষ্টির ফোঁটায় সৃষ্টি হয় ধূসর বরণ কুয়াশা কণার। উঠোনে জমে ওঠে পানি। সে পানির ঘোলা  স্রোত নামে ঢাল বেয়ে। পুলকে আকুপাকু করে ওঠে শিশুদের মন। সহসা খাতার কাগজ ছিঁড়ে তারা তৈরি করে কাগজের নৌকা। সে নৌকা ভাসিয়ে দেয় উঠোনের পানিতে। বর্ষার জলে খাল, ডোবা, বিলঝিল, নদীনালার কাদা পানির তলায় গর্ত করে লুকিয়ে থাকা ছোট–বড় নানা জাতের মাছ বেরিয়ে আসে। ওপর থেকে ঢাল বেয়ে হালকা পানির ¯্রােতে চলে আসে কৈ, শিঙ ও পুঁটি টেংরা মাছের ঝাঁক।

বর্ষা মৌসুমে যখন চারদিক ভিজে ওঠে তখন আমাদের মনও হয় সিক্ত। মৌন নীলের ইশারায় আমাদেরও প্রাণে জেগে ওঠে অজানা কামনা। আমরা হয়ে উঠি মনে মননে বর্ষা মুখর। এ ঋতুর বিচিত্র রূপ শহর ও গ্রামে ভিন্ন ধরনের। সাধারণত গ্রামে বর্ষার শোভা অতুলনীয়। কারণ এখানে রয়েছে বিস্তীর্ন মাঠ ঘাট প্রান্তর এক সবুজ শ্যামল গাছ পালা ও ঝোঁপঝাড়। যেন ফিরে পায় তরতাজা নতুন জীবন। বর্ষাকে ঘিরে নানা ধরনের খেলাধুলা দেখা যায় গ্রামে। যেমন কাবাডি খেলার মূল সময় কিন্তু বর্ষাকালেই। বর্ষার সময়টাতে মাটি থাকে ভেজা কর্দমাক্ত। আজ হয়তো কৃত্রিম উপায়ে অ্যাস্টোটার্ব মাঠে কাবাডি খেলা হয়। কিন্তু যুগ যুগ ধরে আমাদের গ্রামগঞ্জে বর্ষা মৌসুম শুরু হতেই তরুণ যুবক, বৃদ্ধরাও লুঙ্গি কাছা দিয়ে নেমে গেছে কাবাডি খেলায়। বর্ষাকে ঘিরে আবার বেশ কিছু পেশা সজীব হয়ে উঠে। যে সব নিচু ভূমিতে শুকনো মৌসুমে পানি থাকে না সে সব ভূমি বর্ষা এলেই পানিতে ভরে ওঠে। এটাই আমাদের প্রকৃতির বৈশিষ্ঠ্য। পায়ে হাঁটা পথ গুলো সব বর্ষার পানিতে ডুবে যায়। ফলে এসব ভূমি দিয়ে এক গ্রামের সঙ্গে আরেক গ্রামের সঙ্গে, নিকটতম হাটে বাজারের যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায় পানি বাহন নৌকা। তাই মৌসুমী মাঝিদের দেখা পাওয়া যায়। যারা অন্য মৌসুমে হয়তো কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।

বর্ষার মনোহর সৌন্দর্য দর্শন থেকে শহুরে মানুষরা অনেকখানি বঞ্চিত। ইট কাঠ পাথুরে জীবনে বর্ষার আগমন তাদের কাছে তেমন আনন্দের নয় বরং বর্ষা তাদের কাছে এক ধরনের উৎপাত ও বিরক্তিকর। তবে যারা ভাবুক মনের বর্ষার সৌন্দর্য তাদের কাছে অপূর্ব ভাবেই ধরা দেয়। তাই কবির লেখনীর স্পর্শে বর্ষা পায় নতুন রূপ। বর্ষা দরিদ্রের দুয়ারে নিয়ে আসে হতাশা। তাদের ক্ষুদ্র গৃহস্থালী বর্ষার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য তারা ব্যস্ত হয়ে উঠে। মাথা গোছার ঠাঁই নেই যাদের তাদের কষ্টটাই বেশি। পলিথিন মোড়া সংসার নিয়ে তারা যাযাবরের মত কেবলই আশ্রয় খুজেঁ ফিরে।

বর্ষাকাল মানেই আকাশ কালো করা ঘন মেঘের আনাগোনা, যখন তখন ঝমঝমিয়ে পড়ে বৃষ্টি। পথে ঘাটে কাঁদা পানি। ঘরে স্যাঁতসেঁতে ভাব। তাইতো কবি শামসুর রহমান বর্ষার বৃষ্টি নিয়ে লিখেছেন-“ হঠাৎ আকাশ সাদা মুখটি কালো করে, কালো মেঘে বুকটি ফুঁড়ে পানি পড়ে/ ঝর ঝর ঝর একটানা বৃষ্টি ঝরে, বৃষ্টি পড়ে, বৃষ্টি ঝরে”। বর্ষার বৃষ্টিতো অন্যতম। বর্ষার আকাশে রহস্যঘেরা অন্ধকারে নিবিড় হয়ে ওঠে ক্ষণে ক্ষণে। কখনো সমস্ত আকাশ ঘন মেঘে ছেঁয়ে গেলেও বৃষ্টির দেখা পাওয়া যায় না। আবার কখনো বিনা মেঘেই শুরু হয়ে যায় তুমূল বৃষ্টি। নাগরিক যান্ত্রিক জীবনে বৃষ্টিকে প্রায়শই বেমানান। কিছুটা বিরক্তিকরও মনে হতে পারে। অরণ্য প্রকৃতির মাঝেই বৃষ্টি যেন বেশি মানানসই। তাইতো কবিগুরু রবী ঠাকুর তাঁর নৌকাডুবি উপন্যাসে বলেছেন, “বর্ষা ঋতুটা মোটেই উপরে শহুরে মনুষ্য সমাজের পক্ষে তেমন সুখকর না, ওটা অরণ্য প্রকৃতির বিশেষ উপযোগী”। শহুরে জীবনযাপনে বেশির ভাগের কাছে বৃষ্টিটা বিড়ম্বনারই নামান্তর। আবার কখনো কখনো কাঠফাটা রোদ্দুরে ভ্যাপসা গরমে প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত এই বৃষ্টিটাই তখন সকলের কাছে হয়ে ওঠে চরম আরাধ্য, পরম পাওয়া।

এ বৃষ্টিতে তপ্ত ধরণী মুহুর্তেই হয়ে ওঠে শীতল সজীব। সহসাই মন নেচে ওঠে ময়ুরের মতো করে। উচাটন মন তখন কিছুতেই ঘরে থাকতে চায় না। প্রিয়জনের সান্নিধ্য পাওয়ার আশায় হৃদয় ব্যাকুল হয়ে ওঠে। মনের অজান্তেই গেয়ে ওঠে কেউ- ‘এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে নাতো মন/ কাছে যাবো, কবে পাবো/ ওগো তোমার নিমন্ত্রন’। বৃষ্ঠির দিনে কাঙ্খিত সেই প্রিয়জনকে কাছে পেলে বলে দেওয়া যায় হৃদয়ের কোণে জমিয়ে রাখা সব কথা। বৃষ্টি হলে সোহাগিনী বর্ষাকে আমরা ছন্নছাড়া বৃষ্টিবনে রাগ করি। ঠিক ওই পর্যন্তই। কিন্তু আজ নগরায়নের ফলে এবং বৈশ্বিক উষ্ণতার পরিনতিতে বর্ষা দেখা দিচ্ছে নতুন রূপে, নতুন চরিত্রে। তার ওপর আছে নগর জীবনে অপরিকল্পিত স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা। এদেশের মানুষের জীবনাচারের দৃশ্যপট পাল্টে গেছে অনেক। যে লোকটি এখন গ্রামে থাকেন তিনি আর তার গ্রামের ওপরই নির্ভরশীল নন। নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন নগর জীবনের ওপর। অধিকাংশ মানুষের প্রিয় ফলটি পর্যন্ত এখন শহর থেকে কিনে নিয়ে ঘরে ফিরতে হয়। তাই নগর জীবনের দুঃসহ জলাবদ্ধতা দেশবাসীকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। এছাড়া নদীর নাব্যতা হারানোর ফলে অল্প বৃষ্টিতেই বন্যার সম্মূখীন হতে হচ্ছে আমাদের বাংলাদেশকে। বর্ষার সুবিধা অসুবিধা থাকলেও বর্ষা অনেকেরই প্রিয় ঋতু। ধূলি মলিন প্রকৃতির চারদিক ধুয়ে মুছে সাফ করে দেয় বর্ষার পানি। ঝলমল করে উঠে চারদিক। বর্ষার প্রত্যাশায় সকলেই থাকে উন্মুখ।

আপনার মতামত কমেন্টস করুন