মাঠের মধ্যে আপদকালীন ধানের হাঙা- যুগ যুগ ধরে টিকে আছে কৃষকের মাঝে

0
87

 

একেএম.জিলানী, নাচোল (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) থেকে :

বৃহত্তর রাজশাহী বিভাগের বরেন্দ্র অঞ্চলের ধানের মাঠে পাকা ধান কেটে সারা মাঠ জুড়ে সুন্দর কারুময় চোখ জুড়ানো ধানের হাঙা (পালা) দে’য়ার রীতি যুগ যুগ ধরে টিকে আছে কৃষকের মাঝে। এক সময় গরু ও মহিসের গাড়িতে করে কাটা ধান কৃষকের খৈলানে (ধানমাড়া উঠানে) আনা হতো। কিন্ত কালের বিবর্তনে এখন পাওয়ার টিলার ও ট্রাকটর দিয়ে কাটা ধান তোলা হচ্ছে। বোরো ধান কাটাকাটি শুরু হলেই মৌসুমী বর্ষার কারণে বরেন্দ্র অঞ্চলের অতি এঁটেল মাটি কাদায় একাকার হয়ে যায়। তাই ধান পরিবহণের উপযোগি রাস্তা না হওয়া পর্যন্ত কাটাধান মাঠেই হাঙা (পালা) দিয়ে রাখা হয়। এসময় ধানকাটা মাঠে চোখে পড়ে শুধুই পাকা ধানের হাঙা। বৃষ্টির পানিতে ধান পচে নষ্ট না হয় সেজন্য পাকা ধান দিয়েই বিশেষ কায়দায় ছাওয়া হয় হাঙা।

“হাঙা”-শব্দের আঞ্চলিকভাবে অর্থ দাঁড়ায় কাটা ধান সারিবদ্ধভাবে পালা দেওয়া বা সংরক্ষণ করা। আবার নদীমাতৃক অঞ্চল, বিশেষ করে হাওর অঞ্চলে নদীতে ডুবে যাওয়া ধান কেটে বিশেষভাবে বেঁধে পানিতে ভাসিয়ে হাঙা করে আনা হয়। এ অর্থে হাঙা মানে সারিবদ্ধভাবে বেঁধে রাখা। আবার হাঙা শব্দের অন্য অর্থ বিবাহ বা শাদি করা। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে হাঙা অর্থ দ্বিতীয় বিবাহ করা। কিন্তু বরেন্দ্র অঞ্চলে কাটা ধান মাঠে সংরক্ষণের জন্য বিশেষভাবে পালা দেওয়ার নাম হাঙা।

এক সময়ের রাজশাহীর শুস্ক মরুময় সমন্বিত বরেন্দ্র অঞ্চলে বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ(বিএমডিএ)’র গভীর নলকুপ, অগভীর নলকুপ ও সরকারী খাসপুকুর থেকে ফসলের জমিতে সেচ সুবিধা দিয়ে এ অঞ্চল আজ দেশে খাদ্য উদ্বৃত্ত অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। উঁচু নীচু এই বরেন্দ্র অঞ্চলের মাঠের পাকা ধান উঠানোর জন্য অপেক্ষা করতে হয় বেশ কয়েকদিন। ধান কাটা মাঠের মধ্য দিয়ে পুরোপুরি রাস্তা উপযোগি হলে তখন হাঙা ভেঙে ধান যানবাহনে করে কৃষকের বাড়ির খৈলানে (ধান মাড়ায়ের উঠানে) আনা হয়। যুগ যুগ ধরে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকরা ক্ষেতের পেকে যাওয়া কাটা ধান মঠে রাখার হাঙার সাথে পরিচিত। এক সময় মাঠের হাঙা রাতে পাহারা দিতে হতোনা। চোরদের বদ্ধমূল ধারনা ছিল, হাঙা’র ধান চুরি করলে চোরের সর্বনাশ হয়। গৃহস্তের ঘরে সিঁদ কেটে ধান চুরি করতো চোরেরা। কিন্তু মাঠের হাঙা দেওয়া ধান চুরি করতোনা। তবে দিন বদলেছে, বর্তমানে কোন কোন এলাকায় চুরির ভয়ে মাঠের হাঙা পাহারা দিতে হয়।

হাঁকরইল গ্রামের ৯১ বছরের বৃদ্ধ মুসলেমুদ্দীন জানান, বাপ-দাদার আমলের থ্থন ক্ষেতের মাঝে হাঙা দেইখ্খা আসছি। মাঠের হাঙা থাইক্কা চুরেরা ধান চুরি করতোনা।

নেজামপুর গ্রামের ৮৪ বছরের বৃদ্ধ মোকবুল হোসেন জানান, বাপ-দাদার আমল থেকে দেখে আসছি মাঠে কাটা ধানের হাঙা। জমির আইলের পাশে একটু উচু করে ধানের হাঙা দেওয়া হয়। বৃষ্টির পানি হাঙার নীচে না ঢুকতে পারে সেজন্য হাঙার ৩দিকে নালা তৈরী করা হয়। হাঙা দেওয়া ধানের রং ভাল থাকে।

সূর্যপুর মাঠের যোগানদার (পাহারাদার) শামশুল হক জানান, ধান হাঙা দেওয়া হয়ে গেলে আর পাহারা দেওয়া লাগেনা। চোরেরা হাঙা’র ধান চুরি করেনা। এ অঞ্চলের ক্ষুদ্র-নৃ-গোষ্ঠি(আদিবাসী) কৃষক শ্রী নরেন শিং মনে করেন, তাদের লক্ষীপুজার প্রসাদ ও কালিমাতার সিঁদুর মাঠের হাঙা’র চারিধারে ছিটিয়ে দিয়ে মা লক্ষীকে সমর্পণ করে। তাদের যুগ যুগ পরম্পরা ধারনা পুজোর প্রসাদ ও সিঁদুর ছিটিয়ে দিলে মাঠের হাঙা’র ধান চুরি হবেনা। মা লক্ষী পাহারা দিয়ে আগলিয়ে রাখবেন। প্রসাদ ও সিঁদুর দিয়ে বেড়া দেওয়া হাঙা’র ধান চুরি করলে চোরের পরিবার ডাকরা ( পেট ফুলে -ফেঁপে) হয়ে মারা যাবে।

আপনার মতামত কমেন্টস করুন