সোনারগাঁওয়ের সবজি রপ্তানী হচ্ছে বিদেশে

0
494

 

হাসান মাহমুদ রিপন :
মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে রপ্তানি হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের সবজি। ফলে সোনারগাঁওয়ের সনমান্দি ও বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার সবজি চাষিরা দিন দিন সবজি চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। চাষীরা অধিক মুনাফার জন্য ফসলী জমি ছাড়াও লিচু বাগানের ফাঁকে ফাঁকে চাষ করছে বিভিন্ন ধরনের সবজি। তবে সনমান্দি ইউনিয়নের সবচেয়ে বেশী সবজি চাষ হয়। বিশেষ করে শীত মওসুমে সনমান্দিতে লাউ চাষ হয় অনেক। সোনারগাঁওয়ের অন্যান্য ইউনিয়ন থেকে রপ্তানিযোগ্য সবজি সংগ্রহ করা হলেও শীত মওসুমে সনমান্দি ও বৈদ্যোরবাজার ইউনিয়ন থেকে সবচেয়ে বেশি সবজি রপ্তানি হয়ে থাকে। এতে করে চাষীরা প্রতিবছরের অর্থনৈতিক ভাবে লাভবান হচ্ছে।

জানা গেছে, সোনারগাঁওয়ের সনমান্দি ইউনিয়নের মগবাজার, নাজিরপুর, দড়িকান্দি, বাংলাবাজার, নোয়াকান্দি, অলীপুরা, কুমারগাঁও, নয়ানগর, বাটিরচর, সনমান্দি এলাকায় ও বৈদ্যোরবাজার ইউনিয়নের হাড়িয়া, উলুকান্দি, গাবতলী, খংসারদী, দিঘি চাঁনপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্রীস্ম ও শীতকালীন সবজি চাষ হয়। তবে সনমান্দি ইউনিয়নে লাউ চাষ সবচেয়ে বেশী হয়। এসব এলাকা থেকে সৌদিআরব, মালয়েশিয়া, লন্ডনসহ মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের দেশগুলোতে নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে রজব পাতা, লাই পাতা, লাউ শাক, বরবটি, কাকরুল, উচ্ছে, ঝিঙে, লাল শাক, পালং শাক, ডাটা, জালি, কচুমুখী, কচু, মিষ্টি কুমড়া, বেগুন, টমেটো, পটল, চাল কুমড়া, লাউ, কাচা পেপে, কাঁচা কলা, শসা ও শীতকালীন সবজি শিম, লাউ, বাঁধা কপি, ধনিয়াপাতা, টমেটো, কাঁচা মরিচ, মুলাসহ অর্ধশতাধিক সবজি। এসব সবজি চাষ করে চাষীরা ন্যায্য দাম পাওয়ায় বেশ সাবলম্বী হয়ে উঠছেন। পাশাপাশি রপ্তানির সাথে সবজি চাষে জড়িত ব্যাক্তিদের সৃষ্টি হচ্ছে কর্মসংস্থান। সনমান্দি ইউনিয়নের বিশেষভাগ এলাকার প্রধান কাজ হলো সবজি চাষ করা। এ চাষে মহিলারাও সহযোগিতা করে থাকেন। তবে এ মওসুমে করোনায় বিদেশে সবজি রপ্তানীতে এ ব্যাঘাত ঘটেছে বলে জানান রপ্তানীকারক প্রতিষ্টানের লোকজন।

সোনারগাঁও থেকে সবজি রপ্তানিকারক এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, তাদের একটি সবজি রপ্তানীকারক সংস্থা রয়েছে। যার নাম বাংলাদেশ ফুট্রস ভেজিটেবলস এন্ড এলাইড প্রোডাক্স এক্সপোটার্স এসোসিয়েশন। এ সংস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর প্রায় ৮শ’ কোটি টাকার সবজি বিদেশের বাজারে রপ্তানি করে থাকে। এ মওসুমে করোনায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। করোনার কারণে বিদেশে কোন প্রকার সবজি রপ্তানী হয় নি। বিদেশে রপ্তানীতে আমাদের ব্যাঘাত ঘটে। এখন কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। আবার রপ্তানী শুরু হয়েছে। তবে কম। এছাড়া সঠিক পরিবহন ব্যবস্থা না থাকার কারনে চাহিদা অনুযায়ী সবজি রপ্তানি করা যাচ্ছে না। তিনি আরো জানান, জমি থেকে সবজি সংগ্রহ করার পর পুরান ঢাকার সূত্রাপুরের ওয়ার হাউজে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গ্রেডিং, শটিং, কাটিংও প্যাকেজিংয়ের পর নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া শেষে রপ্তানির জন্য বিমান বন্দরে পাঠানো হয়। তিনি জানান, সারা বছরই সোনারগাঁও থেকে সবজি সংগ্রহ করে বিদেশে রপ্তানি করেন। তাছাড়া সবজির পাশাপাশি বিভিন্ন দেশীয় ফলও রপ্তানি করে থাকেন তিনি। এ পুরো রপ্তানির সাথে চাষী পর্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধাপে বহু লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। সবজি রপ্তানিতে উৎসাহী হয়ে অনেক নতুন উদোক্তা সবজি রপ্তানিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

সরজমিনে সনমান্দি ও বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, নিচুও উচু জমির এলাকার পাশাপাশি বাড়ির আঙিনা, রাস্তার পাশে সবজি চাষ করেছেন কৃষকরা। লাউ ক্ষেতের লাউ চাষের পাশাপাশি রজব পাতা ও লাই পাতাসহ মিশ্র চাষ করেছেন স্থানীয় কৃষকরা।

সনমান্দি ইউনিয়নের নাজিরপুর ও মগবাজার গ্রামের লাউ চাষী মোবারক হোসেন, শাহজালাল মিয়া, তোফাজ্জল, কবীর, গোলজার, আমানউল্লাহ, মোক্তার, মতিন, আমির জানান, তাদের উৎপাদিত লাউ বিদেশে রপ্তানি করা হয়। তারা শুধু সনমান্দি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে এ বছর প্রায় ৭০ কানি জমিতে লাউ চাষ করেছেন। গত ২ বছর লাউ চাষ করে বেশ লাভবান হয়েছেন তারা। ফলে এ বছর সবাই অধিক জমিতে লাউ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। মগবাজার গ্রামের মনোয়ারা বেগম প্রথম রজব পাতা ও লাই পাতা চাষ শুরু করেন। সিলেট থেকে রজব ও লাই পাতার বীজ আনা হয়। এ রজব ও লাই পাতা লন্ডনে রপ্তানী হয়।
সোনারগাঁওয়ে সনমান্দি ইউনিয়নের বাটিরচর গ্রামের মুকুল হাসান শিক্ষকতার পাশাপাশি বসতবাড়ির আঙিনায় এবং বাড়ির পাশে ২ বিঘা জমি নিয়ে সারাবছর বিভিন্ন জাতের সবজি চাষ করছেন। ক্ষেত থেকে সরাসরি ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরের পাইকাররা সবজি কিনে নিয়ে যান।

বৈদ্যোবাজার ইউনিয়নের হাড়িয়া গ্রামের সবজি চাষী আমিনুল ইসলাম ও শাহ নেওয়াজ জানান, স্থানীয় বাজারে সবজির ন্যায্য দাম সব সময় পাওয়া যায় না। তবে বিদেশে রপ্তানীর জন্য চাষ করা সবজির ভাল দাম পাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে রপ্তানিকৃত সবজির মান ভাল হতে হয়। তুলনামূলকভাবে বাছাইকৃত সবজিগুলোই বিদেশে রপ্তানি করা হয়ে থাকে।

বিদেশে রপ্তানির জন্য সবজি সাপ্লাইয়ার আঃ করিম ও মোতালেব মিয়া জানান, তারা ১৫ বছর ধরে এ সবজি বিদেশে রপ্তানির কাজে জড়িত। প্রথমে তারা সবজি কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহ করে প্রাথমিকভাবে প্রক্রিয়া করার পর বিদেশে রপ্তানিকারকের কাছে ঢাকার সূত্রাপুরে ওয়ার হাউজে সাপ্লাই দিয়ে থাকেন। এ সাপ্লাই কাজে এ অঞ্চলের ১৫/২০ জন জড়িত রয়েছে। ওয়ার হাউজে নেওয়ার পর রপ্তানিকারকরা সবজি দ্বিতীয় দফায় বাছাই করে কার্টুনে প্যাকিংয়ের পর রপ্তানিযোগ্য করে তোলে।

সোনারগাঁও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মনিরা আক্তার জানান, রাজধানী ঢাকা থেকে সোনারগাঁও কাছাকাছি হওয়ার কারনে সবজি রপ্তানিকারকরা সহজে সবজি সংগ্রহ করতে পারেন। তাছাড়া সোনারগাঁওয়ের সবজি পোকা মুক্ত হওয়ায় খুবই প্রশংসনীয়। সবজি পোকা মাকড় মুক্ত করার বিষয়ে সোনারগাঁও উপজেলা কৃষি অফিস ব্যাপক কাজ করছে। ফলে দিন দিন সোনারগাঁওয়ের সবজি বিদেশে রপ্তানিতে ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে।

আপনার মতামত কমেন্টস করুন